পুজো শেষের অনুভূতি
এবার পুজো শেষের অনুভূতিটা একটু হলেও আলাদা। প্রবাসে সপ্তাহান্তের পুজো দেড়দিনেই ফুরিয়ে গেছে। যদিও পুজোর চারদিন আমার বাড়ির লোকেদের সাথেই ছিলাম বলা চলে; মনে-মনে এবং ফোনে-ফোনে। ঠাকুর ভাসানের পর জনে-জনে সব্বার সাথে কথাও হয়েছে।
মনে পড়ে যায়, আমার বাবার ঠাকুমাকে দেখতাম কোনবার প্রতিমা বিসর্জনের সময় চোখের জল আটকে রাখতে পারতেন না। ধরা গলায় বলতেন, মা চলে গেল, এবার তোমরাও সব চলে যাবে। বাড়ি আবার ফাঁকা হয়ে যাবে। কিছু কিছু অনুভূতির কি তবে বয়স বাড়ে না?
এবার পুজোয় যে আমি বাড়িতে থাকতে পারবনা তার একটা দীর্ঘ মানসিক প্রস্তুতি ছিল। হয়ত সেকারনেই আমার যতটা মনখারাপ হতে পারত, ততটা হয়নি। শুধু মা-বাবাকে ফোনে বিজয়ার প্রণাম জানাতে গিয়ে মনটা হু হু করে উঠল। এটার কোন মানসিক প্রস্তুতি ছিলনা বোধহয়।
সবাইকে শুভ বিজয়ার প্রীতি–শুভেচ্ছা-ভালবাসা-আলিঙ্গন। সব গুরুজনদের আমার প্রণাম। আপাতত কোলাকুলি আর মিষ্টিমুখের অছিলায় মনখারাপটা কমিয়ে আনার পালা আর এখন থেকেই দিন গুনতে থাকা — আসছে বছর আবার হবে।
শুভ বিজয়া।
পেইন কিলার (অণুগল্প)
সুজয় আরেকটু ঘনিষ্ঠ হতেই গলাটা জড়িয়ে ধরে ফিসফিস করে পায়েল – “আজ নয়। প্লিজ। ব্যাক-পেইন-টা বড্ড বেড়েছে।” থমকে গিয়ে পায়েলের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকে সুজয়। “ওঃ, সরি, আগে বলবে তো!”–একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে পায়েলের শরীর থেকে নেমে যায়।
পাশ ফিরে শোয় পায়েল। এপাশ ফিরে শুয়েই বুঝতে পারে সুজয় একবার টয়লেট থেকে ঘুরে এসে আবার পাশেই শুয়ে পড়ল।
আধ ঘণ্টা কেটে যায়, কিন্তু পায়েলের কিছুতেই ঘুম আসছে না। নাঃ, আজ মনে হচ্ছে একটা পেইন কিলার না নিলে ঘুম আসবেনা।
খানিক পর সুজয়ের দিকে পাশ ফেরে পায়েল। সুজয় অঘোরে ঘুমোচ্ছে। বেডল্যাম্পের মৃদু আলোতেও সুজয়ের মুখটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। নির্লিপ্ত, নিশ্চিন্ত।
চমকে ওঠে পায়েল। আধঘণ্টা আগেও তো সুজয়কে একটুও ক্লান্ত লাগেনি। আর পায়েলের অত কষ্ট হচ্ছে জেনেও …………. হঠাৎ খুব কান্না পায় পায়েলের। ব্যথাটা তীব্র হয়।
দৌড়ে উঠে গিয়ে ঘরের সব আলো জেলে দিয়ে আবার সুজয়ের মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ে পায়েল।
তন্ন তন্ন করে খুঁজতে থাকে ………… একটা, শুধু একটা দুশ্চিন্তার দাগ। থুড়ি, পেইন কিলার!
অজান্তে (অনুগল্প)
বাজারে এলে প্রায়দিনই রাজেনের থেকে শাকসব্জি-তরিতরকারি কিছু না কিছু নেয় অনিমেষ। অন্যদের চেয়ে দাম একটু বেশি নেয় ঠিকই, তবে জিনিসটা টাটকা হয়। আর ব্যবহারটাও বড় ভাল। বাজারের থলেতে জিনিষ ভরতে ভরতেই দু-চারটে কথা বলে নেয়। আর সবসময়ে মুখে একটা হাসিমাখা সারল্য লেগে থাকে।
কথায় কথায় একদিন বাড়ির কথা তুলেছিল রাজেন। বাবা শয্যাশায়ী, মা-ও আর কাজে যেতে পারেনা। বউ আর দুটো ছোট ছেলেমেয়ে নিয়ে পাঁচজনের সংসার ওকে একা টানতে হয়।
রাজেনের কাছে গেলে খুব একটা দরদাম করেনা অনিমেষ। বেচারি কটা টাকাই বা লাভ করে এসব বেচে, তাই দিয়েই তো পাঁচজনের ভাত যোগাড় করতে হয়!
দুদিন বাজারে এসে রাজেনকে দেখতে পায়নি অনিমেষ। তৃতীয় দিন রাজেনের পাশে ডুরে শাড়ি দেখে অবাক হয়। এই তিন-সাড়ে তিন বছরে একে তো আগে কখনও দেখেনি। চোখাচোখি হতেই অনিমেষের প্রশ্নটা পড়ে ফেলে রাজেন। একগাল হেসে বলে —“ও লক্ষ্মী গো বাবু, আমার বউ। দেখেন না, জ্বর হয়েছে বলে দুদিন আসতে পারিনি। তা আজ কিছুতেই একা আসতে দিলনা। বললাম আসতে হবেনা, তা কিছুতেই শুনলে না।”
আড়চোখে অনিমেষকে একবার দেখে নিয়ে মাথার ঘোমটাটা ঠিক করে লক্ষ্মী। তারপর রাজেনের কপালে হাত রেখে অভিমানমাখা গলায় নিচু স্বরে বলে “এখনও তো গা গরম আছে। বলছি ওপাশে ছাওয়ায় গিয়ে একটু বোসো, আমি ঠিক এদিকটা সামলাতে পারব।”
হঠাৎ কি একটা হয় অনিমেষের মধ্যে। লক্ষ্মী হাত বুলিয়ে দেওয়ার পর রাজেনের কপালটা যেন চকচক করে ওঠে। পাঞ্জাবির কোণাটা খামচে ধরে অনিমেষ। চাউনির ভাষাও দ্রুত পাল্টে যায়। কিন্তু রাজেনের কোন দিকে হুঁশ নেই। — “আবার দেখেন বাবু, বাড়ি থেকে আমার জন্য টিফিন করে নিয়ে এসেছে! হাঃ হাঃ হাঃ, যত বলি, আরে এসব লাগবেনা………”
রাজেনের হাসিটা আর একটুও সহ্য করতে পারেনা অনিমেষ। ওর হলদেটে দাঁতগুলো যেন ভেংচি কাটছে অনিমেষকে। সব বাঁধ ভেঙ্গে চীৎকার করে ওঠে অনিমেষ —“চুপ কর হারামজাদা। ভ্যাদভ্যাদ করে বকেই চলেছে। আমার সময়ের দাম নেই? তোর এইসব শোনাতে হয়, অন্য কাউকে শোনাস।”
এতখানি তিরস্কারে আহত না হয়ে অবাকই হয় রাজেন। মাথামুণ্ডু কিছু বুঝতে না পেরে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। নিজেকে সামলে নিয়ে কি যেন বিড়বিড় করতে করতে এগিয়ে যায় অনিমেষ।
দরদাম না করে এরপর আর কোনদিন কিচ্ছু নেয়নি অনিমেষ।