মাছের জালে সোনা
– জোতির্ময় (দাদুর মুখে শোনা গল্প)

অনেক দিন আগের কথা। তখন সমুদ্রে মাছ ধরার টানা লম্বা জাল পাওয়া যেত না। তাই গ্রামের সবার কাছ থেকে সংগ্রহ করা হত ছোট ছোট জাল। তারপর সেই জালগুলো জুড়ে সমুদ্রে নামানো হত। তারপর যা মাছ ধরা যেত, তা বাজারে বিক্রী করা হত। এরপর, সব খরচ বাদ দিয়ে বাকি টাকা ভাগ করে দেওয়া হত, যারা জাল দিয়ে ছিলেন, তাদের মধ্যে। প্রতি বারের মত সেবারও এই ভাবে জাল দেওয়া হয়ে ছিল। জাল সমুদ্রে টানা হতে উঠল চকচকে সোনার বাটের মত কিছু। এখানে বলে রাখি, ওই অন্চল দিয়ে যে সব জাহাজ যাতায়াত করে তারা অনেক সময় সোনার বাট বা বিস্কুট লুকিয়ে নিয়ে আসে। এবার কখনো যদি পুলিশের তালাশি হয়, জাহাজ থেকে সেই সব সোনার বাট বা বিস্কুট নামিয়ে দেওয়া হয় সমুদ্রে সরু সুতো দিয়ে। আবার তালাশি শেষ হওয়ার পর পুলিশ জাহাজ থেকে নেমে গেলে সুতো টেনে আবার সেই বাট বা বিস্কুট তোলা হয় জাহাজে।
এই বার ঔ চকচকে জিনিষটা পেয়ে জেলেদের মনে হল জিনিষটা বোধহয় সেইরকম কিছু হবে। তখন নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে সেই জিনিষটা থেকে একটা টুকরো ভেঙ্গে একজন জেলের হাত দিয়ে পাঠানো হল কাছাকাছি শহরে (কাঁথি) যাচাই করতে, জিনিষটা কি? কিন্তু কয়েক দিন কেটে গেলেও, সেই লোকটা আর ফিরল না। তখন বাকি জেলেদের বিশ্বাস জন্মাল যে জিনিষটা নিশ্চয় সোনা।
কিন্তু বড় বাটটা বিক্রী করতে গেলেতো পুলিশের হাতে ধরা পড়ার সম্ভাবনা। তাই তারা ঠিক করল বাটটা টুকরো টুকরো করে ভাঙ্গবে এবং বিক্রী করবে। যেই মত ভাবা, সেই মত কাজ। এরপর তারা পাওয়া টাকার একটা অংশ ভাগ করে দিয়ে ছিল জালের মালিকদের। এই ভাবে দাদুও পেয়ে গেলেন কিছু টাকা।

বন্যা

মায়ের(নির্মলার) মুখে শোনা বন্যার কথা

তখন ১৯৪৫ সাল। তোমার দাদু (কুঞ্জবিহারী) রোজকার মত রাজাপুকুরে তদারকিতে গেছেন। ফেরার পথে চোখ চলে গেল সমুদ্রের দিকে। তখন তো এত বাড়ি , ঘর হয় নি। বাড়ির সামনের রাস্তা থেকেই সমুদ্রের বাঁধ দেখা যেত। প্রথমে তোমার দাদু নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। সকাল থেকেই আকাশের মুখ থমথমে। ঝোড়ো হাওয়াও বইছিল। কিন্তু বহু দূর থেকেও বোঝা যাচ্ছিল সমুদ্রের জল ধেয়ে আসছে।
দাদু তো পড়ি মরি করে বাড়ি ফিরে এসে চিৎকার করে সবাইকে ডাকলেন। বললেন যে যেদিকে পারো পালাও। বাঁধ ভেঙ্গে সমুদ্রের জল ধেয়ে আসছে। তটস্থ হয়েও আমরা কেউই কী করব বুঝে উঠতে পারছিলাম না। ওদিকে দমকা হাওয়ার জোর হঠাৎ বেড়ে গেল আর আমাদের বাড়ির টিনের চাল মড়মড় করতে লাগল, যেন এখনই উড়ে যাবে। দাদু কোথা থেকে একটা কাছি জোগাড় করে টিনের চালায় বেঁধে টান দিয়ে মাটিতে শুয়ে পড়লেন। কিন্তু, একার শক্তিতে কি তা সম্ভব? মনে হল দাদুকে নিয়েই চালটা উড়ে যাবে। কয়েক জন গিয়ে জোর করে দাদুকে সরিয়ে নিতেই বিকট আওয়াজ করে চালটা গেল উড়ে গেল।
ইতিমধ্যেই দেখি আমাদের উঠোনে জল  ঢুকে পড়েছে। বৃষ্টিও শুরু হল তোড়ে। বিমল আর গীতা বাড়ির সকলের থেকে ছোট। তাদের কাপড়ে জড়িয়ে একটা লম্বা গাছের ডালে চটপট বেঁধে দেওয়া হল। আর আমরা যার যেদিকে চোখ যায় সেদিকে ছুট লাগালাম। আমি আর তোমার কাকামনি (জগদীশ)উঠে পড়লাম বড় একটা আম গাছে। তখন দেখি তোমার কাকাবাবু (চিত্ত) লাফ দিয়ে এক খড়ের গাদার মধ্যে ঢুকে পড়েছে। আর কাউকে সেভাবে নজরে পড়ল না। জল ক্রমশঃ উপরে উঠছে আর আমরাও আরও উপরের ডালে উঠে যাচ্ছি। আমাদের চারপাশ দিয়ে কত  কি ভেসে যাচ্ছে। গরু, ছাগল, বাছুর এমনকি মানুষ। তাছাড়া ভেসে যাচ্ছে খাট, চৌকি বাড়ির এরকম কতকিছু। এবার দেখি কয়েকটা সাপও এসে আশ্রয় নিল সেই গাছে।আমাদের ভয় করছিল ঠিকই। তারা কিন্তু কিছুই করল না। তারাও ব্যস্ত নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে